ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ঘাম ঝরানো শ্রমিকের গ্রাম থেকে শিক্ষিতদের জনপদ: বদলে গেছে বনেরডাঙ্গা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Dec 23, 2025 ইং
ঘাম ঝরানো শ্রমিকের গ্রাম থেকে শিক্ষিতদের জনপদ: বদলে গেছে বনেরডাঙ্গা
বনেরডাঙ্গা হিলফুল ফুজুল যুব সংঘের আয়োজনে তাফসীরুল কুরআন মাহফিলের একটি মুহূর্ত।

নিজস্ব প্রতিবেদক | বনেরডাঙ্গা

এক সময় যে গ্রামকে মানুষ চিনত কেবল ‘শ্রমজীবী মানুষের বসতি’ হিসেবে, আজ সেই গ্রামই উন্নয়নের রোল মডেল। যে হাতে একসময় কাস্তে আর কোদাল ছিল নিত্যসঙ্গী, সেই হাতের উত্তরসূরিরা আজ কলম আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে দিচ্ছে একটি জনপদের ইতিহাস। দিনাজপুর পার্বতীপুর/ ভবানীপুর সংলগ্ন  ‘বনেরডাঙ্গা’ আজ আর পিছিয়ে পড়া কোনো গ্রাম নয়; বরং সততা, শ্রম আর শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক আধুনিক জনপদ।

অন্ধকারের বুক চিরে শিক্ষার আলো

বনেরডাঙ্গার ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক সময় এখানকার প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষই ছিল অশিক্ষিত। হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমই ছিল তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। অন্য গ্রামের সম্পন্ন কৃষকরা বনেরডাঙ্গার মানুষদের ‘কামলা’ বা ‘কিষাণ’ বলে ডাকত। কিন্তু সেই তথাকথিত পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য শক্তি ও সততা। আজও সেই পরিশ্রমী মানুষের সুনাম অক্ষুণ্ণ রয়েছে। পরিবর্তনের সূচনা হয় শিক্ষার হাত ধরে। কেরোসিন ল্যাম্পের মিটিমিটি আলোয় যে শিশুরা পড়াশোনা শুরু করেছিল, তাদের অন্তরে বাবা-মায়েরা বুনে দিয়েছিলেন বড় হওয়ার স্বপ্ন। যে বাবা নিজের নামটি পর্যন্ত লিখতে পারতেন না, তিনিই নিজের রক্ত জল করা শ্রমে সন্তানকে শিখিয়েছেন অক্ষরজ্ঞান। আজ সেই সন্তানদের হাত ধরেই গ্রামটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। ব্যবসা, চাকরি ও বিভিন্ন পেশায় আজ প্রতিষ্ঠিত এই গ্রামের অসংখ্য যুবক।

দৃশ্যমান উন্নয়ন ও কাঠামোগত পরিবর্তন

বনেরডাঙ্গায় এখন উন্নয়নের জোয়ার বইছে। এক সময়ের কর্দমাক্ত মেঠো পথ এখন পাকা রাস্তায় রূপ নিয়েছে। গ্রামের প্রতিটি কোণে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, আধুনিক স্কুল আর পরিকল্পিত সামাজিক কার্যক্রমের ফলে বনেরডাঙ্গা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক মডেল গ্রাম। গ্রামের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই আমূল পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।

যুবসমাজের জাগরণ: বনেরডাঙ্গা হিলফুল ফুজুল যুব সংঘ

একটি সমাজকে বদলে দিতে যুবসমাজের ভূমিকা অপরিসীম। বনেরডাঙ্গার এই অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে ২০২৩ সালের ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় “বনেরডাঙ্গা হিলফুল ফুজুল যুব সংঘ”। গ্রামকে মাদকমুক্ত রাখা, ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং আর্তমানবতার সেবায় এই সংগঠনটি এক অনন্য স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও তরুণদের উদ্যমী অংশগ্রহণে সংগঠনটি অল্প সময়েই আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

আধ্যাত্মিক পরশ: সফল তাফসীরুল কুরআন মাহফিল

সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় চেতনার প্রসারে গত ৯ ডিসেম্বর বনেরডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এক বিশাল ‘তাফসীরুল কুরআন মাহফিল’। মাহফিলের প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হযরত মাওলানা মুফতী আমজাদ হোসেন আশরাফী (চেয়ারম্যান, কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদ ও খতিব, কলওয়ালাপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, মিরপুর-১)।শান্তিপূর্ণ ও সাফল্যমণ্ডিত এই মাহফিলে গ্রামবাসী এবং যুবসমাজের ঢল নামে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন ছিল না, বরং এটি ছিল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক অপূর্ব সেতুবন্ধন। এই মাহফিলের মাধ্যমে সমাজে ঐক্য, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের এক নতুন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, যুবসমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধে তারা ভবিষ্যতেও নিয়মিত এমন আয়োজন অব্যাহত রাখবেন।

আগামীর স্বপ্ন: একটি সমৃদ্ধ বনেরডাঙ্গা

বনেরডাঙ্গা এখন আর কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি অনুপ্রেরণার নাম। সংগ্রামের ইতিহাস আর সাফল্যের বর্তমানকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামটি এখন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এক সময়ের ‘কামলা’ বলে অবহেলিত মানুষগুলো আজ গর্বের সঙ্গে বলতে পারে—আমরা পরিশ্রমী, আমরা সফল। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে, বনেরডাঙ্গার এই রূপান্তর আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বনেরডাঙ্গা আজ প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা আর ঐক্য থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করে একটি গ্রামকে আধুনিক মডেলে রূপান্তর করা সম্ভব। এই পরিবর্তনের মিছিলে শরীক হওয়ার আহ্বান এখন প্রতিটি গ্রামবাসীর কণ্ঠে।

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ, থোয়াইচি

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ, থোয়াইচি