প্রিন্ট এর তারিখঃ ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৫:৪৬ AM ||
প্রকাশের তারিখঃ ১০ জুলাই, ২০২৬, ৩:০০ PM
খুলনা আর্ট একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালায় শিক্ষার্থী মুমিনূর জামান (মুমিন) ঐতিহ্যবাহী ফ্যাক্স মেশিন উপহার দিলেন
সৌহার্দ্য বিশ্বাস
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে একসময়ের বহুল ব্যবহৃত অনেক যোগাযোগযন্ত্র আজ ইতিহাসের অংশ। সেই হারিয়ে যেতে বসা প্রযুক্তিগত ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের মহৎ উদ্যোগে যুক্ত হলো আরেকটি মূল্যবান নিদর্শন। খুলনা আর্ট একাডেমির শিক্ষার্থী মুমিনূর জামান (মুমিন) একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালায় একটি Sharp FO-51 ফ্যাক্স মেশিন উপহার দিয়ে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।বর্তমানে মুমিন খুলনা আলিয়া কওমি কামিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তাঁর মা অ্যাড. আয়েশা খাতুন লাকী একজন আইনজীবী। তিনি জজ কোর্ট, খুলনা লিগ্যাল এইড প্যানেল আইনজীবী। মুমিনের বাবা-মায়ের স্বপ্ন, ভবিষ্যতে তিনি একজন দক্ষ প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) হবেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি তাঁরা বিশ্বাস করেন, শিল্পচর্চা মানুষের সৃজনশীলতা, নান্দনিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে বিকশিত করে। তাই ছোটবেলা থেকেই তাঁকে পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে খুলনা আর্ট একাডেমিতে ভর্তি করিয়েছেন।একাডেমিতে এসে প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের গড়ে তোলা ঐতিহ্য সংরক্ষণশালা দেখে মুমিনের মা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। পড়াশোনার পাশাপাশি মুমিন নিয়মিতভাবে চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের কাছে ছবি আঁকা শেখে। শিল্পচর্চার পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিও তার আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে। তার মা একটি ফ্যাক্স মেশিন সংগ্রহ করে খুলনা আর্ট একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালার জন্য প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের হাতে তুলে দেয়। এ সময় মুমিনের মা এডভোকেট আয়েশা খাতুন লাকীও উপস্থিত ছিলেন।এবং তার মা আরও বলেন, ছেলে যতদিন খুলনা আর্ট একাডেমিতে ছবি আঁকা শিখবে, ততদিন প্রতি মাসের বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত ১০০ টাকা দেবেন, যাতে ঐতিহ্য সংরক্ষণের এই মহৎ উদ্যোগে তাঁর সন্তানও অংশ নিতে পারে।মূল্যবান এই উপহার গ্রহণ করে চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস আনন্দ প্রকাশ করে বলেন,“যেসব শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যচর্চায় নিজেদের সম্পৃক্ত করে, তারাই ভবিষ্যতে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারে। মুমিনের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।”তিনি আরও বলেন,“মুমিনের বাবা-মা শুধু সন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকেই গুরুত্ব দেননি; শিল্প-সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। এমন সচেতন অভিভাবকেরাই একটি সুন্দর প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারেন। আমি বিশ্বাস করি, একদিন মুমিন তার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করবে এবং সমাজের একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।”তিনি আরও বলেন,“শিল্পচর্চা মানুষকে শুধু একজন দক্ষ শিল্পী নয়, একজন মানবিক, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলে। নতুন প্রজন্ম যখন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য সংরক্ষণে এগিয়ে আসে, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়। মুমিনের এই মহৎ উদ্যোগ অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
ফ্যাক্স মেশিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মুমিন উপহার হিসেবে যে Sharp FO-51 ফ্যাক্স মেশিনটি দিয়েছে, এটি ২০০০-এর দশকের শুরুতে বহুল ব্যবহৃত একটি থার্মাল ফ্যাক্স মেশিন। ২০০২ সালের দিকে বাজারে আসা এই মডেলটি ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, হাসপাতাল, ট্রাভেল এজেন্সি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ নথি আদান-প্রদানের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো।এটিতে থার্মাল পেপারে প্রিন্টিং সুবিধা, ৪৪৮ কিলোবাইট মেমোরি, ৫-শিট অটো ডকুমেন্ট ফিডার, স্বয়ংক্রিয় Fax/Tel সুইচিং, প্রতি পৃষ্ঠা প্রায় ১৫ সেকেন্ডে ফ্যাক্স পাঠানোর সক্ষমতা এবং কাগজ শেষ হয়ে গেলেও প্রায় ১৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষণের সুবিধা ছিল। ই-মেইল ও অনলাইন যোগাযোগব্যবস্থা জনপ্রিয় হওয়ার আগে এ ধরনের ফ্যাক্স মেশিন অফিস যোগাযোগের একটি অপরিহার্য প্রযুক্তি ছিল। বর্তমানে এটি একটি ভিন্টেজ প্রযুক্তিপণ্য হিসেবে বিবেচিত হয় এবং প্রযুক্তির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে।উল্লেখ্য, চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস ২০২২ সালে তার পিতাকে হারিয়ে পিতার ব্যবহৃত বিষয় নিয়ে নিজের শৈশবের স্মৃতি এবং বাংলার ঐতিহ্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে খুলনা আর্ট একাডেমিতে একটি ঐতিহ্য সংরক্ষণশালা গড়ে তোলেন। দীর্ঘদিনের সংগ্রহ প্রচেষ্টায় বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩০০ ধরনের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। কৃষকের ব্যবহৃত বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র, গ্রামীণ জীবনের ব্যবহার্য উপকরণ, পুরোনো প্রযুক্তিপণ্য, খেলাধুলার স্মারকসহ নানা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই সংগ্রহশালা নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস জানার এক অনন্য কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা আর্ট একাডেমি দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোরদের ছবি আঁকা, সংগীত, আবৃত্তি, হাতের লেখা এবং চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সহায়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে আসছে। পাশাপাশি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে মানবিক, সৃজনশীল ও দেশপ্রেমিক নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতেও প্রতিষ্ঠানটি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।সম্প্রতি দৈনিক কালের কণ্ঠ তাদের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে খুলনা আর্ট একাডেমির ঐতিহ্য সংরক্ষণশালার ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করেছে, যা দর্শকমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণের এই উদ্যোগকে আরও সমৃদ্ধ করতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ খবীরুদ্দীন।
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ রাজু আহমেদ খান শহীদ ।
আইন-বিষক সম্পাদকঃ এডঃ সুদীপন মোহাম্মাদ।
সম্পাদকীয় কার্যালয়ঃ নৈহাটী, রূপসা, খুলনা। মোবাইলঃ ০১৭৩২৫৯২৪৭১