প্রিন্ট এর তারিখঃ ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫০ PM ||
প্রকাশের তারিখঃ ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৮:২৬ PM
মহিদুল ইসলাম (শাহীন) খুলনা
উপকূলীয় জেলা খুলনায় লবণাক্ততা, জোয়ার-ভাটা, জলাবদ্ধতা ও ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে কৃষি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। প্রতিকূল পরিবেশের পাশাপাশি ধান উৎপাদনে শ্রমিক সংকট, ক্রমবর্ধমান শ্রমমূল্য এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে জমিতে চারা রোপণের চাপও কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং সময় ও শ্রম সাশ্রয় করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এটি হয়ে উঠেছে অপরিহার্য।
বিশেষ করে ধান রোপণ, কর্তন ও মাড়াইয়ের মতো শ্রমনির্ভর কাজে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার কৃষকদের শ্রমিক সংকট মোকাবিলা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে খুলনার কৃষকদের দোরগোড়ায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধানের চারা রোপণের পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন এবং দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), স্যাটেলাইট স্টেশন, খুলনা।
নতুন ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণাগার উন্নয়ন (এলএসটিডি) প্রকল্পের আওতায় ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, খুলনার( প্রযুক্তি গ্রাম) বটিয়াঘাটা বয়ারভাঙ্গায় ০৫ একর জমিতে ট্রের মাধ্যমে ম্যাট টাইপ চারা উৎপাদন, ব্রি উদ্ভাবিত বীজ বপন যন্ত্র এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে যান্ত্রিকভাবে ধান রোপণ ও হাতে কলমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তববায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হলো স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বিদ্যমান প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয়করণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা।
এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ আগস্ট বয়ারভাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রযুক্তি গ্রামে আধুনিক ধান উৎপাদন যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিকীকরণ প্রযুক্তির ওপর এক দিন ব্যাপী হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। একইসঙ্গে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের প্রায়োগিক পরীক্ষণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের প্রায় ৪৫ জন শিক্ষার্থী, ৬ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্র (CIMMYT), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় কৃষকরা অংশ নিয়েছেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী অধ্যাপক ড. মো: নজরুল ইসলাম,সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান আসমাউল হুছনা,সহকারী অধ্যাপক মোঃ তুহিনুল হাসান,সহকারী অধ্যাপক
গাজী তমিজ উদ্দিন,প্রভাষক
মোছাঃ সাবিনা আলীম,প্রভাষক
জয় শংকর বৈদ্য,সিমিটের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেনট কো-অর্ডিনেটর হাফিজুর রহমান,
খুলনা মফস্বল প্রেসক্লাব সভাপতি মহিদুল ইসলাম শাহীন,সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম নবী সহ শত শত কৃষক কৃষাণী উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “কৃষির আধুনিকায়নে শুধু উন্নত যন্ত্র মাঠে নিয়ে গেলেই হবে না। যন্ত্রের সঠিক ব্যবহার, উপযোগী চারা উৎপাদন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা তৈরি করতে হবে। এলএসটিডি প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা স্থানভিত্তিক প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কৃষি পেশাজীবীদের তথা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করছি।” তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি গ্রামগুলোকে আমরা বাস্তব মাঠপর্যায়ের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছি।
ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন খুলনা এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি রাইস ট্রান্সপ্লান্টার তথা অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি মাঠে চালিয়ে দেখানো নয়। স্থানীয় কৃষকের বাস্তব চাহিদা, জমির আকার, মাটির অবস্থা, চারা ব্যবস্থাপনা, সময় ও শ্রমের প্রয়োজনীয়তা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করাই আমাদের উদ্দেশ্য।”তিনি আরও বলেন, “মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, যান্ত্রিক রোপণের মাধ্যমে সময় ও শ্রম উভয়ই উল্লেখ যোগ্যভাবে কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে প্রযুক্তিটি কৃষকের কাছে টেকসইভাবে পৌঁছে দিতে হলে মানসম্মত ম্যাট বা ট্রে চারা উৎপাদন, দক্ষ অপারেটর তৈরি, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে যন্ত্রসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় আমরা এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
প্রশিক্ষণ শেষে ঐ দিন বিকেলে বয়ারভাঙ্গা বিলে যন্ত দিয়ে ধান রোপণ এবং একই যন্ত্রের মাধ্যমে সার প্রয়োগ করা হয়। এসময় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক,সাংবাদিক,এলাকাবাসী ও এলএসটিডির কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।