বিশেষ প্রতিনিধি
গুদামে ১৩ লাখ টন মজুতের দাবি, বন্দরে-পাইপলাইনে আরও ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন; অথচ সার না পেয়ে সড়কে কৃষক, চাহিদা, আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
আমন মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও ক্ষোভ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। কোথাও ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার মিলছে না, কোথাও ডিলার পয়েন্টে দীর্ঘ অপেক্ষার পর খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে কৃষকদের। অথচ জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই; বরং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরকারের মজুতের হিসাব আর মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র, এই দুইয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধানই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর সকালে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার গাড়াগঞ্জ বাজারে সার না পেয়ে গাছের গুঁড়ি ফেলে গাড়াগঞ্জ-শৈলকুপা আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, তারা ভোর থেকেই ডিলার পয়েন্টে সার নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু সকাল ১০টার দিকে ডিলার শুভ এন্টারপ্রাইজের কর্মচারীরা সার দেওয়া হবে না বলে জানালে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ চলার পর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশের আশ্বাস এবং সার বিতরণ শুরু হলে কৃষকরা অবরোধ তুলে নেন। তবে ঘটনাটি শুধু একটি এলাকার বিচ্ছিন্ন সমস্যা কি না, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট বাজারে সোনাহাট স্থলবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, আমন চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিলার পয়েন্টে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তারা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছিলেন না। এতে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষোভ গড়ায় সড়ক অবরোধে।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলায় পর্যাপ্ত সারের দাবিতে বুড়িমারী-লালমনিরহাট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকরা। আমন ধান রোপণের পর জমিতে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগের সময় সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। ফলে সারের দাবিতে মহাসড়কে নামতে বাধ্য হন তারা। অর্থাৎ ঝিনাইদহ, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট, তিন ভিন্ন জেলার ঘটনায় একটি অভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে: কৃষকের প্রয়োজনের সময়ে ডিলার পর্যায়ে সার পাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
তিনি বলেন, গত বছর একই সময়ে দেশে সারের মজুত ছিল প্রায় ১২ লাখ টন। বর্তমানে সরকারি গোডাউনে প্রায় ১৩ লাখ টন সার মজুত রয়েছে। এর বাইরে বন্দরে কিংবা জাহাজে পাইপলাইনে রয়েছে আরও প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮০০ টন। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে সারের মোট চাহিদা ৪০ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন।
তার বক্তব্যের সারকথা, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে সারের সংকট হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি পর্যাপ্ত সার থাকে, তাহলে কৃষককে সার পেতে কেন ভোর থেকে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এখানেই সামনে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গত বছরের সঙ্গে চলতি বছরের সারের চাহিদার হিসাবের পার্থক্য। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রধান রাসায়নিক সারের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৫৯ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে, ইউরিয়া: ২৬ লাখ মেট্রিক টন, ডিএপি: ১৫.২ লাখ মেট্রিক টন, এমওপি: ১০.১ লাখ মেট্রিক টন, টিএসপি: ৭.৬৫ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে চলতি বছরে কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে বছরে সারের মোট চাহিদা ৪০ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন।
অর্থাৎ দুটি হিসাব পাশাপাশি রাখলে গত বছরের প্রায় ৫৯ লাখ টনের তুলনায় চলতি বছরের চাহিদা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন, যা প্রায় ১৮ লাখ ৭১ হাজার টন কম। এখানেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে: চাহিদা নির্ধারণের পদ্ধতিতে কি পরিবর্তন এসেছে? কোন কোন সারকে চলতি বছরের ৪০ লাখ ২৯ হাজার টনের হিসাবের মধ্যে ধরা হয়েছে? গত বছরের প্রায় ৫৯ লাখ টনের হিসাবের সঙ্গে চলতি বছরের হিসাবটি কি একই ভিত্তিতে করা হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত শুধু মজুতের পরিমাণ দেখিয়ে সার সংকট নেই, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। বন্দরে সার আছে, কিন্তু কৃষকের হাতে পৌঁছাবে কবে? সারের সংকট বিশ্লেষণে শুধু মোট মজুতের পরিমাণ দেখলেই হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সার কোথায় আছে এবং কৃষকের হাতে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সেপ্টেম্বর মাসের বার্থিং পজিশন-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের বহিঃনোঙরে সারবাহী দুটি জাহাজ আসার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজে কানাডা থেকে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি এবং অন্যটিতে রাশিয়া থেকে প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি আসার কথা রয়েছে। অর্থাৎ আমদানির জাহাজ থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়, জাহাজ থেকে সার খালাস, ব্যাগিং, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত বিএডিসির গুদামে পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হচ্ছে?
মরক্কোর সার আমদানিতেও সময়ের বড় হিসাব
চলতি সেপ্টেম্বরের ১ থেকে ৯ তারিখের মধ্যে মরক্কো থেকে সার আমদানির জন্য ছয়টি লটের টেন্ডার আহ্বানের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে তিনটি জাহাজে টিএসপি এবং দুটি জাহাজে ডিএপি আমদানির কথা রয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত লে-ক্যান সময় শেষের দিকে চলে এলেও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মাত্র একটি জাহাজ লোড পয়েন্টে পৌঁছেছে; বাকি চারটি জাহাজ এখনো পৌঁছায়নি।
এখানেই সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সময় নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দেয়। কারণ মরক্কো থেকে জাহাজ লোড হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছাতেই প্রায় দেড় মাস সময় লাগতে পারে। এরপর জাহাজ থেকে সার খালাসে প্রায় ২০ দিন, ব্যাগিংয়ে প্রায় এক মাস এবং পরিবহন ঠিকাদারের মাধ্যমে বিএডিসির গুদামে পৌঁছাতে আরও ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগার কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ বিদেশে টেন্ডার আহ্বান বা জাহাজের জন্য চুক্তি করলেই পরদিন কৃষকের হাতে সার পৌঁছে যাচ্ছে না। কৃষিমন্ত্রীর হিসাবে বন্দরে বা জাহাজে পাইপলাই
নতুন সংবাদ প্রতিদিন